বৈষম্যের চাদরে ঢাকা সেবা

মনোহরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স অযত্নে নষ্ট অবকাঠামো

প্রকাশিত: ২০ এপ্রিল, ২০২৬ ০১:০৯:৪৯

মনোহরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স অযত্নে নষ্ট অবকাঠামো

তৌফিকা সুলতানা ঋতু, মনোহরদী: মনোহরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স—একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান। কিন্তু বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির সার্বিক চিত্র স্থানীয় জনগণের মধ্যে ক্রমবর্ধমান হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেবার মান নিয়ে দীর্ঘদিনের অভিযোগের পাশাপাশি এখন যুক্ত হয়েছে সরকারি সম্পদের অযত্ন ও অব্যবস্থাপনার সুস্পষ্ট প্রমাণ।

অব্যবহৃত অ্যাম্বুলেন্স ও ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনা
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স প্রাঙ্গণে দীর্ঘদিন ধরে এক বা একাধিক অ্যাম্বুলেন্স পড়ে থাকতে দেখা যায়। যেখানে জরুরি প্রয়োজনে রোগী বহনের জন্য অ্যাম্বুলেন্স দুর্লভ, সেখানে সরকারি গাড়িগুলো অব্যবহৃত অবস্থায় মরিচা পড়ে নষ্ট হচ্ছে। একই চিত্র দেখা যায় হাসপাতালের ভবনগুলোর ক্ষেত্রেও। কিছু স্থাপনা ফেলে রাখার কারণে সেগুলোতে ফাটল ধরছে ও পরিত্যক্ত অবস্থায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এসব সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবহার উপযোগী করে রাখা জরুরি হয়ে পড়েছে।

স্বাস্থ্যসেবায় অনিয়ম ও বৈষম্যের চিত্র
হাসপাতালের বহির্বিভাগে নির্ধারিত টিকিট মূল্যের চেয়ে বেশি অর্থ আদায়ের অভিযোগ পুরনো। সেবা গ্রহীতাদের মতে, যেখানে ৩ টাকা মূল্যের টিকিটের কথা, সেখানে বাস্তবে ৫ টাকা কিংবা ১০ টাকা গুনতে হয়। ওষুধ বিতরণ প্রক্রিয়ায় দেখা যায় সুস্পষ্ট বৈষম্য। পরিচিত ব্যক্তি বা যাদের 'ফাতেমা আপা' বলে সম্বোধন করা হয়, তারা সিরিয়াল উপেক্ষা করে অতিরিক্ত ওষুধ পেয়ে যান। পক্ষান্তরে, সাধারণ রোগীদের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয় শুধুমাত্র ফলিক অ্যাসিডের একটি পাতা, যেখানে মাসজুড়ে ক্যালসিয়াম ও আয়রন সাপ্লিমেন্ট প্রদানের নিয়ম রয়েছে।

প্রাইভেট ক্লিনিক কেন্দ্রিক সিন্ডিকেটের আভাস
হাসপাতালের আরেকটি উদ্বেগজনক দিক হলো সরকারি চিকিৎসকদের সঙ্গে আশপাশের বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের প্রত্যক্ষ সংযোগ। অভিযোগ রয়েছে, হাসপাতালের কিছু কর্মী ও দালাল পরিচয়দানকারী ব্যক্তি রোগীদের নির্দিষ্ট প্রাইভেট ক্লিনিকে পরীক্ষা করাতে বাধ্য করেন। সম্প্রতি এক গর্ভবতী রোগী আল্ট্রাসনোগ্রামসহ অন্যান্য পরীক্ষা নিজ উদ্যোগে অন্য একটি ক্লিনিক থেকে করিয়ে আনলে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক রিপোর্ট না দেখেই রোগীকে অপমান করেন এবং দালালদের ডেকে কেন রোগী 'বাইরে' পরীক্ষা করালো, তা নিয়ে তিরস্কার করেন। এমন ঘটনা স্পষ্ট করে দেয় যে, এখানে চিকিৎসাসেবার চেয়ে ব্যবসায়িক লেনদেনের স্বার্থই মুখ্য হয়ে উঠেছে। আল্ট্রাসনোগ্রাফি কক্ষ থাকা সত্ত্বেও সেটি অধিকাংশ সময় সচল থাকে না বলেও জানা গেছে।

দৃষ্টি আকর্ষণ ও প্রত্যাশা
উল্লেখ্য, মনোহরদী উপজেলা দেশের মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নিজ নির্বাচনী এলাকা। যে এলাকার উন্নয়ন ও স্বাস্থ্যসেবার মান সরাসরি মন্ত্রীর নেতৃত্বের প্রতিফলন হিসেবে বিবেচিত হয়, সেখানে এমন অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা হতাশাজনক। এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে মাননীয় মন্ত্রীর বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণের পাশাপাশি নিম্নোক্ত দাবিগুলো জানানো হচ্ছে:

১. অব্যবহৃত অ্যাম্বুলেন্সগুলো দ্রুত মেরামত করে সেবায় যুক্ত করা এবং পরিত্যক্ত ভবনগুলো সংস্কার করে ব্যবহার উপযোগী করা।
২. টিকিট মূল্যের অনিয়ম বন্ধে কঠোর নজরদারি স্থাপন এবং ওষুধ বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।
৩. সরকারি চিকিৎসকদের ডিউটি সময়ে প্রাইভেট ক্লিনিক সংশ্লিষ্টতা ও দালাল চক্রের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

মনোহরদীবাসীর প্রত্যাশা, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি প্রকৃত অর্থেই একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গণমানুষের আস্থা ফিরে পাবে।

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন



আরো সংবাদ














ব্রেকিং নিউজ