অধ্যাপক আলী রীয়াজ

আমলাতন্ত্র সংস্কারবিরোধী, আমলারা রাজনৈতিক প্রভুদের অধী‌নে চল‌তে চায়

প্রকাশিত: ০৪ অক্টোবর, ২০২৬ ০২:৫৯:০৩

আমলাতন্ত্র সংস্কারবিরোধী, আমলারা রাজনৈতিক প্রভুদের অধী‌নে চল‌তে চায়

প্রজন্ম ডেস্ক: বাংলাদেশের সংকটের মূল কারণ ইতিহাস নয়, বরং ১৯৯১ সালের পর থেকে রাষ্ট্রযন্ত্রের রাজনীতিকীকরণ বলে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির ডিস্টিংগুইশড অধ্যাপক আলী রীয়াজ। তিনি বলেছেন, ২০০৯ সালের পর তা দলীয় যন্ত্রে পরিণত হয়েছে। আমলাতন্ত্রকে সংস্কারবিরোধী ও রাজনৈতিক প্রভুদের তাঁবেদার বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

রোববার (৪ অ‌ক্টোবর) সকা‌লে রাজধানীর পান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে বে অব বেঙ্গল কনভারসেশ‌নের দ্বিতীয় দিন ‘দ্য অথরস টেবিল’ শীর্ষক সেশনে তিনি এসব কথা বলেন। 

‘বাংলাদেশ কি চক্র ভাঙতে পারবে?’ শিরোনামের এই সেশন হো‌টে‌লের মেঘনা কক্ষে অনুষ্ঠিত হয়। সেশনে ‘এ ফ্র্যাকচারড পাথ’ বইয়ের কেন্দ্রীয় প্রশ্নগুলো নিয়ে আলোচনা হয়। এতে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণের ব্যর্থতার কারণ, মূল শক্তিগুলোর ভূমিকা, কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা এবং চলমান উত্তরণ টেকসই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা তৈরি করতে পারবে কি না, সেসব বিষয় উঠে আসে।

বাংলাদেশের সংকটের কারণ উল্লেখ ক‌রে আলী রীয়াজ বলেন, এক নম্বর হলো রাজনীতিকীকরণ, বিশেষ করে ১৯৯১ সালের পর থেকে পরবর্তী সরকারগুলোর সময়ে। আর ২০০৯ সালের পর এটি সহজ ও সরলভাবেই একটি দলের যন্ত্র হয়ে গেছে। এটি ৪৭ নয়, ৭১ নয়। ইতিহাসের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। আমি যথাসম্ভব স্পষ্ট করে বলছি, এটি রাজনীতিকীকরণ—ক্ষমতাসীন দলের দিক থেকেও, আবার আমলাতন্ত্রের পক্ষ থেকেও, যারা রাজনৈতিক প্রভুদের অধীন হয়ে চলতে রাজি।

আমলাতন্ত্রকে ‘সংস্কারবিরোধী’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, আমি এটা বলছি, কারণ ১৫-১৬ মাস, বিশেষ করে নয় মাস আমি তাদের সঙ্গে কাজ করেছি। এই বিশাল গণঅভ্যুত্থান ও পুরোনো ব্যবস্থাকে জনগণের পুরোপুরি প্রত্যাখ্যানের পরও তাদের কোনো পরিবর্তনে অনিচ্ছাই আমি দেখেছি। সংস্কার ঠেকাতে তারা যত বাধা সৃষ্টি করা সম্ভব, তাই করেছে। তাই তাদের বেদিতে বসিয়ে আড়াল করার চেষ্টা না করি। যা সত্য, তাই বলি। এক নম্বর, তারা সংস্কারবিরোধী। দুই নম্বর, আমলাতন্ত্র হিসেবে নয়, বরং রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে রাজনৈতিক প্রভুদের সেবা করতেই তারা বেশি পছন্দ করে। আমি জানি, আমি খুব সাধারণীকরণ করছি, তবে মোটাদাগে এটাই চিত্র।

‘চক্র ভাঙা সম্ভব কি না’ প্রশ্নে সেশনের শিরোনাম প্রসঙ্গে আলী রীয়াজ বলেন, এটি তার পছন্দে করা নয়, আয়োজকদের সিদ্ধান্ত।

বাংলাদেশ চক্র ভাঙতে পারবে কি না, এই প্রশ্নে তিনি বলেন, এটি ভেঙে বেরিয়ে আসা যাবে না, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো এখনই বড্ড তাড়াহুড়ো হবে। আমি আশাবাদী। আশাবাদী না হলে আমি সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রধান হতাম না, কিংবা ৯ মাস সকাল থেকে সন্ধ্যা, এমনকি তারও পরে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কথা বলে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে কাজ করতাম না। তবে এর সঙ্গে একটি শর্তও জুড়ে দেন তিনি। 

বাংলাদেশ চক্র ভাঙতে পারে, কিন্তু সব সময় একটি সতর্কতা আছে—রাজনৈতিক শক্তিগুলো কি তা করতে ইচ্ছুক?

জনগণের আকাঙ্ক্ষার পক্ষে তিনটি ইঙ্গিতের কথা তুলে ধরেন আলী রীয়াজ। প্রথমত, কোনো রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব ছাড়াই গণঅভ্যুত্থান। তিনি বলেন, এখন স্বাধীন অবস্থানে আছি বলে এটা বলতে পারছি, যা আগে পারিনি। ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান ছিল দেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে প্রত্যাখ্যান। সহজ ও সরল কথা। পরে তারা সেই জায়গা আবার দখল করেছে, কিন্তু সেটি ছিল প্রত্যাখ্যান।

দ্বিতীয় ইঙ্গিত হিসেবে তিনি গণভোটের কথা উল্লেখ করেন। তার ভাষ্য, পাঁচ কোটি মানুষ হ্যাঁ বলেছে, দুই কোটি মানুষ না বলেছে। সব মিলিয়ে সাত কোটি। তারা কী বলছে, তা বোঝা দরকার। আমি নিশ্চিত, তারা তা বুঝেছে, কারণ এই একই ভোটার একটি রাজনৈতিক দলকে ক্ষমতায় এনেছে।

তিনি বলেন, তারা কি চায়? হ্যাঁ, চায়। এটা কি করা সম্ভব? হ্যাঁ, সম্ভব, তবে একটি শর্তে। একই কাজ বারবার করে ভিন্ন ফল আশা করাকে কী বলা হয়, তা শ্রোতাদেরই বুঝে নিতে বলেন তিনি।

স্বৈরতন্ত্রের ক্ষেত্রে একই নীতিমালা ব্যবহার করলে, যিনিই করুন না কেন, ফল সব সময় স্বৈরাচারেই গড়ায় বলে মন্তব্য করেন তিনি।

উপজাতীয় রাজনীতি (ট্রাইবাল পলিটিক্স) প্রসঙ্গে আলী রীয়াজ বলেন, আমি এই শব্দবন্ধে বলব না। আমি এখনো মনে করি, দলীয় রাজনীতির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের অভাব আছে। তবু আমি উপজাতীয় রাজনীতির ভাষায় যাব না।

সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীর হাতে সব ক্ষমতা

কী কী বদলাতে হবে-এ বিষয়ে শ্রীরাধা দত্তকে করা প্রশ্নের প্রসঙ্গ টেনে আলী রীয়াজ বলেন, বিচার বিভাগ স্বাধীন না হলে, নির্বাচন কমিশন স্বাধীন না হলে গণতান্ত্রিক উত্তরণ সম্ভব নয়।

সংবিধানের বর্তমান কাঠামোর কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশের সংবিধান যেভাবে লেখা, তাতে সব ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর হাতে। কেউ চাইলেই পড়ে দেখতে পারেন। সংবিধান বিশেষজ্ঞ হতে হয় না। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ প্রধানমন্ত্রীর অধীন। নিয়োগ রাষ্ট্রপতির নামে হলেও সংবিধানেই তা লেখা আছে। এতে কোনো অস্পষ্টতা নেই। এটি না বদলালে স্বাধীনতা আশা করবেন কীভাবে?

তার মতে, নির্বাহী বিভাগের প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ বিচার বিভাগ এবং গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্য মৌলিক অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর অনেকাংশে অতিমাত্রায় রয়েছে। প্রজাতন্ত্রের প্রশ্নেও এসব বিষয় সমাধান করা জরুরি বলে মনে করেন তিনি।

শেষে আলী রীয়াজ বলেন, আমাদের কেউ কেউ এটা ভুলে যাচ্ছেন বলে মনে হয়। খেলার নিয়ম না বদলালে একই কাজ আবারও করা হবে। ইতোমধ্যে তেমন ইঙ্গিতও আছে। এটাই কষ্টের। এক বছর আগে আমি লাল না হোক, অন্তত হলুদ পতাকা তুলে ধরার চেষ্টা করেছিলাম। এ হলো পথ। এক বছর পর এসে আপনারাই বিচার করুন।

অধ্যাপক আলী রীয়াজ ছাড়াও আলোচনায় অংশ নেন ইউরোপীয় পার্টনারশিপ ফর ডেমোক্রেসির সিনিয়র আন্তর্জাতিক উপদেষ্টা মাইকেল লিডাউয়ার এবং ভারতের ওপি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্ত। সেশন সঞ্চালনা করেন ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের অ্যাডজাংক্ট ফ্যাকাল্টি মোহাম্মদ সাজ্জাদুর রহমান।

এ সম্পর্কিত খবর

এমপি হিসেবে প্রত্যাশিত কাজ না পাওয়ার অভিযোগ মাহমুদা মিতুর

আমলাতন্ত্র সংস্কারবিরোধী, আমলারা রাজনৈতিক প্রভুদের অধী‌নে চল‌তে চায়

সেপ্টেম্বরে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৪২৩ জন

শক্তিশালী গ্রামীণ অর্থনীতিই গড়ে তুলতে পারে শক্তিশালী বাংলাদেশ: প্রধানমন্ত্রী 

মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করে আখতারুজ্জামানকে মুক্তি দিন : গোলাম পরওয়ার

মানুষের পকেট কেটে নেওয়া বিএনপি দেশকে ধ্বংস করে দিচ্ছে

ঢাকায় ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন’, অংশ নেবেন ১০০টির বেশি দেশের প্রতিনিধি

৪৯তম বিসিএসে বাদ পড়াদের গেজেটভুক্তির দাবিতে ডাকসুর বিক্ষোভ

রমজানের আগে ২ হাজার ইউপি নির্বাচন করার পরিকল্পনা ইসির

স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন মহিলা এমপি মিষ্টি

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন



আরো সংবাদ














ব্রেকিং নিউজ